হরে অর্থ কী বা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য কী?

 হরে অর্থ কী বা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য কী?

 "হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে"


ইতিহাস ও তাৎপর্য

ইতিহাসঃ

এই মন্ত্রটি সর্বপ্রথম ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে রচিত কলি-সন্তরণ উপনিষদ্-এ উল্লিখিত হয়; যেটি কৃষ্ণ যজুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত। এই গ্রন্থের মতে, এই মন্ত্রটি জোরে জোরে উচ্চারণ করলে কলিযুগের সকল কুপ্রভাব দূরীভূত হয়।

হিন্দুধর্মের গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে এই মন্ত্রটি বিশেষ জনপ্রিয়। খ্রিস্টীয় ১৬শ শতাব্দীতে ভক্তি আন্দোলনের নেতা চৈতন্য মহাপ্রভু সারা ভারতে বিশেষত বাংলা  উড়িষ্যায় "প্রতি নগরে ও গ্রামে" ভ্রমণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে এই "মহামন্ত্র"টি জনপ্রিয় করে তোলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রথা অনুসারে, মন্ত্রটি উচ্চৈঃস্বরে বারংবার সংগীতবাদ্য সহযোগে ভজন, দলবদ্ধভাবে কীর্তন বা একান্তভাবে মনে মনে জপ করা হয়। কারণ, এই সম্প্রদায়ের অনুগামীরা মনে করেন, মন্ত্রের শব্দ উচ্চারণকারী ও শ্রোতাকে মুক্তি দান করবে।

১৯৬০-এর দশক থেকে, মন্ত্রটিকে শ্রীকৃষ্ণ  চৈতন্য মহাপ্রভুর ঐকান্তিক ভক্ত অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর গুরুর (শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর) নির্দেশে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহর (১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে) থেকে শুরু করে জীবনের শেষ এগারো বছর ধরে মোট চৌদ্দবার বিশ্ব পরিক্রমা করে গোটা পশ্চিমী বিশ্বে একটি সুপরিচিত শব্দসমাহারে পরিণত করেন।

তাৎপর্যঃ

এই মহামন্ত্রে তিনটি শব্দ আছে, সেগুলো হলোঃ 
(১) হরে, (২) কৃষ্ণ এবং (৩) রাম।

"হরে" মানে হরণ করা বা হরণ হওয়া। এটা এসেছে হরণ শব্দ থেকে, যার মানে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া। হরে বা হরণ করা। ঈশ্বরকে আবাহন করে বলা হয় যেন তিনি মানুষের মাঝে জড়তার কামনাকে, সকল দুঃখ কে হরণ করে নিয়ে যান।

"হরে কৃষ্ণ-হরে রাম"

"কৃষ্ণ" নামের অর্থ সর্বাকর্ষক, "রাম" নামের অর্থ সর্ব মনোরম এবং "হরে" হল ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তিকে সম্বোধন। সুতরাং এ মহামন্ত্রের অর্থ হচ্ছে-

"হে সর্বাকর্ষক, সর্ব মনোরম, হে ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি, কৃপা করে আমাকে তোমার ভক্তিযুক্ত সেবায় নিয়োজিত কর"

তাহলে "কৃষ্ণ" মানে চিত্তাকর্ষক আর "রাম" মানে মনোহর। তাহলে হরে কৃষ্ণ মানে চিত্তাকর্ষক, চিত্তহরণ করুণ। অর্থাৎ হরে রাম মানে মনোহর, আমার মন হরণ করুণ।

 হরিনাম মহামন্ত্রের তাৎপর্যঃ

আমরা জানি, শ্রীমন্ মহাপ্রভু প্রচারিত ও প্রসারিত 'হরিনাম' বা 'হরে কৃষ্ণ' মহামন্ত্র ষোলো নাম বত্রিশ অক্ষর রুপী। কিন্ত নামকীর্ত্তন বা জপ করতে যেয়ে আমরা পাই মাত্র তিনটি নাম 'হরে', 'কৃষ্ণ' 'রাম'পরমকরুনাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোলোকপতি সচ্চিদানন্দ অর্থাৎ সৎ, চিৎ ও আনন্দ রুপী ত্রিগুণের অধিকারী। এই ত্রিগুণ হলো সন্ধিনী, সংবিৎ ও হ্লাদিনী বা কর্ম, ঞ্জান ও ভক্তি রুপী। এই ত্রিগুণের অন্তর্গত হরে , কৃষ্ণ ও রাম নামেই অন্তর্নিহিত। তাই মনুষ্যজীবনে আমাদের উচিত হরে কৃষ্ণমহামন্ত্রের তাৎপর্য ও এই ষোলো নাম বত্রিশ অক্ষর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে পারমার্থিক জীবনে উন্নয়ণ ঘটানো। নিম্নে হরে কৃষ্ণমহামন্ত্রের তাৎপর্য কি, তা বর্ণিত হলঃ

 অষ্ট হরেনামের তাৎপর্য

প্রথম, ‘হরে’- চন্দ্রাবলী
দ্বিতীয়, ‘হরে’- প্রেমময়ী শ্রীরাধা
তৃতীয়, ‘হরে’- সুভাষিণী
চতুর্থ, ‘হরে’- সিংহাসন
পঞ্চম, ‘হরে’- সুদর্শন
ষষ্ঠ, ‘হরে’- শেষ দেব
সপ্তম, ‘হরে’- সাবিত্রী
অষ্টম, ‘হরে’- রেবতী

 চারি কৃষ্ণনামের তাৎপর্য

প্রথম, ‘কৃষ্ণ’- পরম ব্রহ্ম শ্রীগোবিন্দ
দ্বিতীয়, ‘কৃষ্ণ’- বাসুদেব
তৃতীয়, ‘কৃষ্ণ’- জগন্নাথ
চতুর্থ, ‘কৃষ্ণ’- বলভদ্র

 চারি রামনামের তাৎপর্য

প্রথম, ‘রাম’- শ্রীরাধিকা
দ্বিতীয়, ‘রাম’- লক্ষ্মী
তৃতীয়, ‘রাম’- সরস্বতী
চতুর্থ, ‘রাম’- সুভদ্রা

পর্যায়ক্রমে ষোলোটি গুহ্যনাম হলোঃ

০১/ হরে - চন্দ্রাবলী,
০২/ কৃষ্ণ - শ্রীগোবিন্দ,
০৩/ হরে - প্রেমময়ী শ্রীরাধা,
০৪/ কৃষ্ণ - বাসুদেব,
০৫/ কৃষ্ণ - জগন্নাথ,
০৬/ কৃষ্ণ - বলভদ্র,
০৭/ হরে - সুভাসিনী,
০৮/ হরে - সিংহাসন,
০৯/ হরে - সুদর্শন,
১০/ রাম - শ্রীরাধিকা,
১১/ হরে - শেষদেব,
১২/ রাম - লক্ষ্মী,
১৩/ রাম - সরস্বতী,
১৪/ রাম - সুভদ্রা,
১৫/ হরে - সাবিত্রী এবং
১৬/ হরে - রেবতী।

হরিনাম মহামন্ত্রের বত্রিশ অক্ষরের তাৎপর্য

০১/ ’- অক্ষরে শ্রীললিতা সখী মস্তকেতে ।
০২/ রে’- অক্ষরে শ্রীবিশাখা দক্ষিণ বাহুতে ।।
০৩/ কৃ’- অক্ষরে চম্পকলতা সখীকন্ঠে রয় ।
০৪/ ষ্ণ’- অক্ষরে চিত্রা সখী বাহুতে শোভয় ।।
০৫/ ’- অক্ষরে রঙ্গদেবী সখী থাকে হাতে ।
০৬/ রে’- অক্ষরে সুদেবী যে থাকয়ে পৃষ্ঠেতে ।।
০৭/ কৃ’- অক্ষরে তুঙ্গবিদ্যা বদন উপরে ।
০৮/ ষ্ণ’- অক্ষরে ইন্দুরেখা শ্রবণ বিবরে ।।
০৯/ 'কৃ’- অক্ষরে শশীরেখা রহে ভুরুযুগে ।
১০/ ষ্ণ’- অক্ষরে বিমলা সখী ভ্রুর ডান ভাগে ।।
১১/ কৃ’- অক্ষরে পালিকা সখী ভ্রুর বামে রয় ।
১২/ ষ্ণ’- অক্ষরে লবঙ্গমঞ্জরী থাকয়ে হৃদয় ।।
১৩/ ’- অক্ষরে শ্যামলা সখী নাভীতে থাকয় ।
১৪/ রে’- অক্ষরে মধুমতী নাভি মধ্যে রয় ।।
১৫/ ’- অক্ষরে ধন্যা সখী করাঙ্গুলি রয় ।
১৬/ রে’- অক্ষরে মঙ্গলা কর অধোমুখী হয় ।।
১৭/ ’- অক্ষরে শ্রীদাম সখা জঙ্ঘায় থাকয় ।
১৮/ রে’- অক্ষরে সুদাম সখা জানু নিবসয় ।।
১৯/ রা’- অক্ষরে বসুদাম সখা থাকে ভুরু অঙ্গে ।
২০/ ’- অক্ষরে অর্জুন সখা সদা থাকে লিঙ্গে ।।
২১/ ’- অক্ষরে সুবল সখা দক্ষিণ পদেতে ।
২২/ রে’- অক্ষরে কিঙ্কিণী সখা আছয়ে বামেতে ।।
২৩/ রা’- অক্ষরে চাতক সখা পূর্বে নিবসয় ।
২৪/ ’- অক্ষরে মধুমঙ্গল অগ্নিকোণে রয় ।।
২৫/ রা’- অক্ষরে শুক সখা থাকয়ে দক্ষিণে ।
২৬/ ’- অক্ষরে বিশাল সখা রয় নৈঋর্ত কোণে ।।
২৭/ রা’- অক্ষরে মহাবল সখা পশ্চিমে থাকয় ।
২৮/ ’- অক্ষরে বৃষভ সখা বায়ুকোণে রয় ।।
২৯/ '’- অক্ষরে দেবপ্রস্থ সখা উত্তরেতে ।
৩০/ রে’- অক্ষরে উদ্ভব সখা আছে ঈশানেতে ।।
৩১/ '’- অক্ষরে মহাবাহু ঊর্ধ্বে রয় সুখে ।
৩২/ 'রে’- অক্ষরে ঈশান সখা আছে অধোমুখে ।।

পরমকরুনাময় সচ্ছিদানন্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবার জীবন সুন্দরময়, কল্যাণময় আর মঙ্গলময় করুণ।

ধন্যবাদ। ভাল লাগলে শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে"

Like: facebook/একাদশী বার্তা

উৎসঃ বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও উইকিপিডিয়া। 

Comments